পর্ব- ০২
অস্থির সময়: আমাদের রুচির অবক্ষয়
"ও-ই কিরে, ও-ই কিরে, মধু মধু রসমালাই রসমালাই আগুন আগুন..."— সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ধরনের শব্দগুচ্ছ ভাইরাল হয়ে উঠেছে। ফেসবুক, টিকটকসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আজ এসব অযথা শব্দের চর্চায় নিমজ্জিত। প্রশ্ন জাগে, আমাদের আগ্রহের বিষয় ও রুচির কতটা অধঃপতন হলে আমরা এমন অর্থহীন বাক্যকে বিনোদন হিসেবে গ্রহণ করি? এই পবিত্র রমজান মাসেও আমরা কোরআন, হাদিস কিংবা আত্মশুদ্ধির কোনো আলোচনার পরিবর্তে এসব অর্থহীন ট্রেন্ড নিয়ে ব্যস্ত। সমাজ ও সংস্কৃতির এমন অবক্ষয় আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে।
আমরা এক হুজুগে প্রজন্মের সাক্ষী
আমি প্রায়শই নিকটজনদের কাছে বলি— আমরা এক অস্থির ও হুজুগে জেনারেশনের সাক্ষী হয়ে যাচ্ছি। আমাদের চারপাশের মানুষের রুচি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাদের কাছে সভ্যতা, ভদ্রতা এবং শালীনতা কেবলই হাস্যকর বিষয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় যেকোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেই দেখা যায়, সেখানে অশালীন মন্তব্য, ব্যক্তি আক্রমণ এবং অসংযত ভাষার ছড়াছড়ি। সম্মানিত ব্যক্তি হোন বা সাধারণ মানুষ, যদি কেউ কারও পছন্দসই কথা না বলে, তাহলেই শুরু হয় কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, যাকে-তাকে ‘তুই-তুমি’ বলে অসম্মান করা এখন যেন ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো ব্যক্তি বয়সে বড় হোক বা জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করুক, তাকে অবজ্ঞা করার প্রবণতা আমাদের সমাজে ভয়ংকরভাবে শেকড় গেড়েছে। তরুণ প্রজন্মের একাংশের ভাবখানা এমন যেন তারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিদ্বান এবং তাদের মতের বাইরে কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়। অথচ, প্রকৃত শিক্ষিত ও রুচিশীল ব্যক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নম্রতা, সহনশীলতা ও বিনয়।
সোশ্যাল মিডিয়া: বিকৃত রুচির প্রকাশমঞ্চ
সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের চিন্তাকে আরও গতিশীল করতে পারত, সৃজনশীলতার জগতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারত। কিন্তু বাস্তবে, এটি অনেকাংশে রুচিহীনতা, হীনমন্যতা এবং অপসংস্কৃতির চর্চার প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে। এখনকার বেশিরভাগ ট্রেন্ডই হয় অশ্লীল, নয়তো অর্থহীন। সামাজিক অবক্ষয়ের সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো, মানুষ কোনো কিছু যাচাই না করেই শুধু বিনোদনের নামে যে কোনো কিছু ছড়িয়ে দিচ্ছে, লাইক-কমেন্ট-শেয়ারের প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
একটি উন্নত সমাজ গঠনের জন্য যেখানে প্রয়োজন শিক্ষা, শালীনতা, এবং মূল্যবোধ, সেখানে আমরা উল্টো পথে হাঁটছি। ট্রেন্ডের পেছনে ছুটতে গিয়ে আমরা ভুলে যাচ্ছি আমাদের নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কী হওয়া উচিত। একটা সময় ছিল, যখন তরুণ সমাজ দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখত, নতুন কিছু উদ্ভাবনের আকাঙ্ক্ষা রাখত। অথচ, আজ আমরা এমন একটি প্রজন্ম দেখছি, যারা মূলত বিনোদনের নামে অপসংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করছে।
সমাজ বদলাতে কী করণীয়?
এই পরিস্থিতির উত্তরণ সম্ভব, তবে এর জন্য প্রয়োজন সচেতনতা ও ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা। আমরা যদি নিজেরাই সভ্য ও রুচিশীল আচরণ করি, তবে আশপাশের মানুষও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হবে। আমাদের উচিত এমন কিছু প্রচার করা, যা মানুষের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বাড়ায়। ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিক গুণাবলির প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে।অপ্রয়োজনীয় বিষয় নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয় কনটেন্টকে ভাইরাল করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, একটি জাতির প্রকৃত উন্নতি নির্ভর করে তার সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ওপর। যদি আমরা সচেতন না হই, তবে অদূর ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ সামাজিক অবক্ষয়ের মুখোমুখি হতে হবে। তাই, আসুন আমরা হুজুগের পেছনে না ছুটে বাস্তব জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করি।