Featured লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Featured লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, এপ্রিল ১৮, ২০২৫

মানবপ্রকৃতি ও প্রকৃতির নীরব প্রতিক্রিয়া


প্রকৃতি
কি এই অন্যায় নিরবে সহ্য করে? না। সে তো নীরব, কিন্তু অন্ধ নয়। সে দেখে মানুষ কেমন করে খুন করে, নিপীড়ন চালায়, বিশ্বাসঘাতকতা করে, হিংসা ছড়ায়। প্রকৃতি হয়তো কাঁদে না, চিৎকার করে না; কিন্তু একসময় তার ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। তখন সে ঝড় হয়ে ওঠে সিডর, আম্পান, ভূমিকম্প, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, খরা, বন্যা- সবই যেন মানুষের পাপের নিরব প্রতিক্রিয়া।

আজ প্রকৃতি ভারসাম্য হারিয়েছে, ঠিক যেমন মানুষ হারিয়েছে বিবেক। গ্রীষ্মে শীত, শীতে গ্রীষ্ম, আকাশের রঙে বিষন্নতা, বাতাসে গন্ধ নেই, যেন সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে- “তোমরাই কি আমার নিয়ন্ত্রক? না আমি তোমাদের?”

এই বৈপরীত্য আর কাকতালীয় নয়। এটা মানুষ নামের জীবের লোভ, অবিচার, এবং সীমাহীন আত্মমোহের ফল। মানুষের মধ্যে এখন স্বাভাবিক জীবনযাত্রার চেয়ে প্রতিযোগিতা, প্রতিহিংসা, এবং একে অন্যকে ঘায়েল করার কৌশলই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কারণে আজ মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠছে “মানুষ কি সত্যিই আশরাফুল মাখলুকাত?”

কখনো কখনো মনে হয়, সৃষ্টিকর্তাও হয়তো ভাবছেন- “আমি কেন এমন একটি জাতিকে সৃষ্টি করলাম, যারা ক্ষমতা আর লাভের জন্য সবকিছু ভুলে যেতে পারে?”( নাউজুবিল্লাহ! হে আল্লাহ!! আমাদের ক্ষমা করো!!!)

সমস্যা হলো আমরা নিজেদের ভুল বুঝি, তবু স্বীকার করি না। কাকে ঠকিয়ে কে বড় হবে, কাকে দমন করে কে ক্ষমতা পাবে, এসব হিসাবের মাঝেই হারিয়ে যাচ্ছে সহানুভূতি, মায়া, ভালোবাসা। সত্য বললে কেউ পাশে দাঁড়ায় না, অথচ মিথ্যার রঙে রাঙানো কুকর্মীরা হয়ে ওঠে নায়ক।

তাই বলা যায়, প্রকৃতি আর সমাজ দুটোরই ভারসাম্য আজ ভেঙে পড়েছে। একটি নষ্ট হলে অন্যটি তার প্রতিক্রিয়া দেয়। আর যদি আমরা এখনই না থামি, না বদলাই; তবে হয়তো একদিন প্রকৃতিই আমাদের চূড়ান্ত জবাব দিয়ে দেবে, এমনভাবে, যেখান থেকে ফিরে আসা অসম্ভব।

মুখোশধারীদের সমাজে অতি-ভদ্রতা একটি পাপ


এই সমাজ
, সমাজের মানুষগুলো, জীবন ও পৃথিবী- সবই এক গভীর বৈচিত্র্যে পূর্ণ। এখানে কেউ চেহারায় নিষ্পাপ, কিন্তু অন্তরে ধূর্ত; কেউ মুখে নীতিকথা বলে, কিন্তু পেছনে কুৎসার বীজ বপন করে। মানুষ চেনা সত্যিই দুঃসাধ্য, কারণ মানুষ চেনা যায় না চোখের দৃষ্টিতে, চেনা যায় সময়ের আয়নায়। সম্পর্ক, সৌজন্যতা কিংবা উপকার এসবের উপর ভিত্তি করে কাউকে চেনা প্রায়শই বিভ্রান্তিকর। কারণ মানুষের প্রকৃত চরিত্র, তার অন্তর্নিহিত রূপ, ধীরে ধীরে সময়ের পরীক্ষায় প্রকাশ পায়। এ যেন এক দীর্ঘ নাট্যচিত্র, যেখানে কেউ অভিনয়ে পটু, কেউ শুধু নির্বাক দর্শক।

আজকাল মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তাদের উপকারীর প্রতি অসহিষ্ণুতা। অতীতে তুমি যার উপকার করেছো, একদিন তাকেই হয়তো দেখবে তোমার বিপদ ডেকে আনছে। যার জন্য নিজে কিছু করেনি, তার উপকারও সে নিতে চায়। কিন্তু যখন উপকারের উপায় শেষ হয়ে যায়, তখন সেই মানুষটিই উপকারকারীর ক্ষতির চিন্তায় মত্ত হয়। উপকারের বিনিময়ে কৃতজ্ঞতা নয়, বরং অসূয়া হয়ে ওঠে তার প্রতিক্রিয়া। কেন? কৃতজ্ঞ হওয়ার বদলে সে কেন হয়ে ওঠে হিংস্র ও প্রতিহিংসাপরায়ণ? কারণ মানুষ যতক্ষণ সুবিধা পায়, ততক্ষণ সে শান্ত থাকে। কিন্তু যখন সে বুঝে, তার চাওয়া পূরণ আর সম্ভব নয়, তখন তার ভিতর ভালোবাসা নয় বরং বিদ্বেষ জন্মাতে শুরু করে। উপকার পেতে পেতে একসময় সে ভুলে যায়, কৃতজ্ঞতা কাকে বলে। বরং তাকে ঘিরে তৈরি হয় এক ধরনের অহংবোধ, সে ভাবে, "আমিই এই উপকারের যোগ্য ছিলাম, এ তো আমার প্রাপ্য।"

বিশেষ করে যদি তুমি ভদ্র, শান্ত, সহনশীল এবং সহজ-সরল হয়ে থাকো, তবে তোমার বিপদ আরও বাড়ে। কারণ সমাজের এক শ্রেণির মানুষ দুর্বলতার সুযোগ নিতে সদা প্রস্তুত। তারা জানে, তুমি প্রতিবাদ করবে না, চিৎকার করবে না, সুতরাং তোমার পিঠেই সবচেয়ে বেশি আঘাত করা যায়। এরা মুখে মিষ্টি, অন্তরে বিষাক্ত। এদের জন্য ভদ্রতা যেন নিজের বিপদের দাওয়াতপত্র।

এক শ্রেণির মানুষ আছে, যাদের সমাজে বলা হয় “মেধাবী”। এই বিশেষণ তাদের আত্মতুষ্টির এমন এক চূড়ায় পৌঁছে দেয়, যেখানে তারা ভুলে যায় যে, সত্যিকারের জ্ঞান বিনয়ের জন্ম দেয়, অহংকারের নয়। সমাজের অন্ধ প্রশংসা যখন একটানা কারো প্রতি বর্ষিত হয়, তখন তার ভেতরে জন্ম নেয় এক প্রকার আত্মম্ভরিতা। সে তখন নিজেকে অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ ভাবতে শুরু করে, ভুলে যায় নিজের বাস্তব পরিচয়, তার পারিবারিক ভিত্তি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক অবস্থান আদৌ কতটা শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে। সে বুঝতে পারে না, যোগ্যতা শুধু কাগজে-কলমে নয়, মানসিকতা, মানবিকতা, সততা সবকিছু মিলেই তা পূর্ণতা পায়।

তাদের কাছে নিজেকে বড় দেখানোর সহজ উপায় হলো অন্যদের ছোট করা। বিশেষ করে, যারা প্রকৃত অর্থে মেধাবী, সৎ এবং নির্লোভ, তাদের প্রতি আক্রমণ করাই এদের প্রিয় কাজ। মিথ্যা কথা, চরিত্রহনন, গুজব রটানো, এমনকি দুঃসময়ে ছুরি মেরে দেওয়া, এগুলো যেন তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়। কারণ যদি তারা সেই প্রকৃত যোগ্যদের সম্মান দেয়, তবে নিজেদের কৃত্রিম শ্রেষ্ঠত্ব বজায় থাকবে কীভাবে? সে ভাবে, অন্যকে মাটিতে নামিয়ে আনলেই সে আকাশে উঠবে।

এই চতুর, আত্মম্ভরী, কথিত মেধাবী মানুষগুলো যখন সমাজের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন তাদের চারপাশে জড়ো হতে থাকে সুবিধাবাদী গোষ্ঠী।এই সুবিধাবাদীরাই তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, গড়ে ওঠে এক সামাজিক অসুস্থতা। তারা চায় বিশৃঙ্খলা, কারণ বিশৃঙ্খল সমাজেই সবচাইতে বেশি সুবিধা পাওয়া যায়। সত্য, ন্যায়, মেধা, মূল্যবোধ- সব কিছু তখন হাস্যকর হয়ে দাঁড়ায়। এই গোষ্ঠী নিজেদের প্রয়োজনেই কুৎসাকারীদের পৃষ্ঠপোষকতা করে, তাদের দিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে, আর সমাজে একটি পঁচনশীল কাঠামোর জন্ম দেয়।

যদি এইসব অন্যায়ের সামনে তুমি নীরব থাকো, যদি তুমি ভাবো ভদ্রভাবে এড়িয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে, তবে তুমি ধ্বংসকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছো। কারণ এরা নীরবতাকে ভয় পায় না, বরং প্রশ্রয় মনে করে। তারা তখন নিজের সীমা ভুলে নিজেকে অপ্রতিরোধ্য ভাবতে শুরু করে।

এই মুখোশধারীরা মানবিকতা বোঝে না, বিবেক বোঝে না, কৃতজ্ঞতা বোঝে না। এদের কাছে সৌজন্য এক ধরনের বোকামি, ভদ্রতা একধরনের দুর্বলতা, আর নৈতিকতা একধরনের আবেগপ্রবণ বেহায়াপনা। তাদের সামনে তোমাকে তাদের ভাষাতেই কথা বলতে হবে, বলতে হবে সত্যের ভাষায়, যুক্তির ভাষায়, প্রয়োজনে কঠোরতার ভাষায়। ভদ্রতা নয়, দৃঢ়তা হোক তোমার ঢাল। ক্ষমা নয়, বিচার হোক তোমার শপথ। কারণ, একমাত্র প্রতিবাদীরাই ইতিহাস গড়তে পারে আর নীরবরা হয় কেবল নির্যাতনের পাতার একটি নাম। 

এ প্রসঙ্গে বলবো- 

"ভদ্র হওয়া ভালো , নীরব থাকা উত্তম। কিন্তু এটাও ধ্রুব সত্য- ভদ্রতা যদি সত্যকে চাপা দেয়, তবে সেটি কাপুরুষতা। তাই সত্যকে চিৎকার করে জানাও এবং এটাই ভদ্রতার প্রকৃতরুপ।"

সোমবার, মার্চ ২৪, ২০২৫

ডিজিটাল প্লাটফর্ম বনাম বাস্তবতা

পর্ব- ০১












আন্তরিকতার উপাখ্যান

- খন্দকার এম এ আউয়াল 


মানুষ সামাজিক জীব। দলবদ্ধভাবে বসবাস ও পারস্পরিক সহমর্মিতার মাধ্যমেই গড়ে উঠেছে তার সভ্যতা। একসময় মানুষের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল পারস্পরিক সম্পর্ক, আত্মীয়তার বন্ধন, একে-অপরের প্রতি মায়া-মমতা। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে, বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের ফলে, এই আন্তরিকতার জগতে এক নতুন রূপান্তর দেখা যাচ্ছে।

আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তি আমাদের সংযুক্ত করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই সংযোগে উষ্ণতার অভাব স্পষ্ট। একসময় যেখানে সম্পর্কের ভিত্তি ছিল ভালোবাসা ও সহমর্মিতা, সেখানে এখন কৃত্রিমতা আর লোকদেখানো মানবিকতা জায়গা করে নিচ্ছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এখন প্রয়োজনের আবেদনে আবদ্ধ, আন্তরিকতার বদলে স্বার্থ আর প্রতিযোগিতাই হয়ে উঠেছে মুখ্য।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আমাদের দূরত্ব ঘুচিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেইসঙ্গে আমাদের হৃদয়ের দূরত্বও যেন বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। মানুষ এখন একে অপরের পাশে থেকেও আসলে অনেক দূরে, ভার্চুয়াল জগতে যতটা সংযুক্ত, বাস্তব জীবনে ততটাই বিচ্ছিন্ন। মায়া-মমতা ও ভালোবাসার অভিব্যক্তি এখন 'রিঅ্যাকশন' আর 'কমেন্ট'-এর জালে সীমাবদ্ধ। ক্ষমতার লোভ, নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখানোর প্রবণতা, আর লোক দেখানো সহানুভূতি সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে এক অদৃশ্য বিশৃঙ্খলার দিকে।

বর্তমান সমাজের প্রতিচ্ছবিতে বা মানুষের আচরনে সামাজিকতা কিংবা আন্তরিকতার বিপরীতমুখী গ্রাফের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের লক্ষণ ভালোভাবেই ফুটে উঠছে। মানুষের মধ্যে ক্রমশ একধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছে, যা শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবে ও। পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন শিথিল হয়ে যাচ্ছে, আত্মীয়তার সংজ্ঞা কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। একসময় যেখানে পরিবার ও প্রতিবেশীর সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করা ছিল স্বাভাবিক, সেখানে এখন নিজস্ব স্বার্থই হয়ে উঠেছে প্রধানতম দিক।

এই প্রবণতা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। সম্পর্কের উষ্ণতা কমে যাওয়ায় একাকিত্ব, হতাশা, এবং মানসিক অবসাদ বাড়ছে ক্রমাগত। কৃত্রিম জীবনের চাপে মানুষ সত্যিকারের আবেগ অনুভব করতেও যেন ভুলে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল দুনিয়ার প্রশংসা আর স্বীকৃতির পেছনে ছুটতে গিয়ে বাস্তব জীবনে হারিয়ে ফেলছে "আন্তরিকতা"।

এর ফলে সমাজে সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার অভাব তৈরি হচ্ছে প্রকটভাবে। কেউ বিপদে পড়লেও পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা কমে যাচ্ছে, কারণ "নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত" থাকার সংস্কৃতি গভীরভাবে শিকড় গেড়ে ফেলেছে। আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে জন্ম নিচ্ছে অবিশ্বাস, ঈর্ষা ও অযৌক্তিক প্রতিযোগিতা, যার ফলে নষ্ট হচ্ছে সমাজের ভারসাম্য, নৈতিকতা ও মানবিকতা।

সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, নতুন প্রজন্ম এই পরিবেশেই বেড়ে উঠছে। তারা প্রকৃত আন্তরিকতা কেমন, তা জানার সুযোগ পাচ্ছে না। পরিবার থেকে আন্তরিকতার শিক্ষা না পেলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সম্পর্কের সংজ্ঞা হয়তো শুধুই প্রয়োজনমাফিক ব্যবহার হয়ে দাঁড়াবে।

সুতরাং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিকট সত্যিকার অর্থে আন্তরিকতা কি এবং তা কিভাবে সামাজিক সম্পর্ক বির্নিমান করে, সে সম্পর্কে প্রচ্ছন্ন ধারণা দেওয়াটা অতীব জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদেরকে অনুধাবন করাতে হবে যে, আন্তরিকতা সত্যিই একটা বিরল গুণ, যা কোনো সার্টিফিকেট, ট্যালেন্ট বা স্ট্যাটাস দিয়ে মাপা যায় না। এটা একদম হৃদয়ের গভীর থেকে আসে, কৃত্রিমতা দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না। যারা সত্যিকারের আন্তরিক, তাদের অনুভূতিগুলো মুখের ভাষার আগে প্রকাশ পায়, চোখের চাহনি, ব্যবহারে ধরা পড়ে। কিন্তু আজকের ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ায় অনেকে শুধুই উপস্থিতি দেখায়, সংখ্যার খেলা বাড়ায়, অথচ ভেতরে কোনো উষ্ণতা থাকে না। এটাই এখনকার এক বড় বাস্তবতা, অনেক সম্পর্ক কেবল স্ক্রিনের আড়ালেই থেকে যায়, আত্মার সংযোগ সৃষ্টি হয় না।

তবে আশার দিক হচ্ছে মানুষের এই রোবটিক জীবনের মাঝেও আন্তরিকতা একেবারেই হারিয়ে যায়নি, শুধু তা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সম্পর্কগুলোকে আবার নতুন করে উপলব্ধি করতে হবে, ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশকে কৃত্রিমতার মোড়ক থেকে বের করে আনতে হবে। সত্যিকারের মানবিকতা তখনই ফিরবে, যখন আমরা প্রযুক্তিকে নয়, মানুষকেই প্রাধান্য দেবো মন থেকে, আন্তরিকভাবে।

আন্তরিক মানুষেরা সবসময় আলাদা, তাদের সংখ্যা কম হলেও তারা হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। আন্তরিকতা আসলে দূরত্ব বা মাধ্যমের ওপর নির্ভর করে না, বরং মানুষের ইচ্ছা, মানসিকতা, আর অনুভূতির গভীরতার ওপর নির্ভর করে। যদি সত্যিকারের সংযোগ গড়ার ইচ্ছা থাকে, তবে সেটা ভার্চ্যুয়াল হোক বা বাস্তব সবখানেই সম্ভব।

অনেক সময় আমরা দেখি, বাস্তব জীবনেও মানুষ মুখোমুখি থেকেও অনুভূতিহীন হয়ে যায়, আবার কেউ কেউ হাজার মাইল দূরে থেকেও পরম আত্মীয়তার মতো পাশে থাকে। আসল ব্যাপারটা হলো বোঝার ক্ষমতা, সহানুভূতি, আর সম্মানের জায়গাটা ঠিক রাখা।

এখনকার সময়ে অনেক সম্পর্কই যেমন লেনদেনের মতো হয়ে গেছে এমন যে, স্বার্থ থাকলে গুরুত্ব আছে, না থাকলে বিস্মৃতির ধুলায় ঢাকা পড়ে যায়। আন্তরিকতা, অনুভূতি, আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা যেন কৃত্রিমতার চাপে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত পরিবর্তনশীলতা ও ধৈর্যের অভাব, পরস্পরের প্রতি সত্যিকারের যত্ন নেওয়ার অভ্যাসও কমে যাচ্ছে। ভার্চ্যুয়াল দুনিয়া সম্পর্কগুলোকে সহজলভ্য করে তুললেও, অনেক ক্ষেত্রে এগুলো গভীরতা হারিয়ে ফেলে, যেন শুধু ‘অনলাইন স্ট্যাটাস’ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ!

তেমনি এর বৈপরীত্য ও পরিলক্ষিত হয় কিছু কিছু ক্ষেত্রে, যেমন এখনো কিছু সম্পর্ক আছে, যেগুলো স্বার্থ ছাড়িয়ে গিয়ে হৃদয়ের গভীর থেকে আসে। যারা সত্যিকার অর্থে অনুভূতি বোঝে, তারা কৃত্রিমতার ফাঁদে আটকে যায় না। 

হ্যাঁ, একদম ঠিক! পৃথিবীতে এখনো ভালো মানুষ আছে বলেই আন্তরিকতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। যারা স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে সম্পর্ক গড়ে তোলে, যারা অন্যকে সত্যিকার অর্থে মানুষ হিসেবে দেখে, তাদের কারণেই এখনো ভালোবাসা, সম্মান, আর মানবিকতা বেঁচে আছে।

এই ভালো মানুষগুলোর সংখ্যা কম হলেও, তাদের অস্তিত্বই প্রমাণ করে যে আন্তরিকতা একেবারে বিলীন হয়ে যায়নি। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য দরকার সত্যিকারের বোঝাপড়া, ধৈর্য, আর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। যারা শুধু নেওয়ার জন্য আসে, তারা কৃত্রিমতার আবরণে ঢেকে যায়, কিন্তু যারা দেওয়ার মানসিকতা রাখে, তারা সম্পর্ককে জীবন্ত রাখে। তারা বর্তমান সমাজ ও সম্পর্ক গুলোকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নৈতিক, মানবিক ও আন্তরিক সমাজ বিনির্মানে তাদের অব্যাহত প্রচেষ্টায় নিয়োজিত থাকে নিরলস।


মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৪, ২০১৪

ব্রিটেনে নিষিদ্ধ হতে চলেছে পর্ন



ব্রিটেনে নিষিদ্ধ হতে বানালে বা প্রকাশ করলে হতে পারে দু’বছরের কারাদণ্ড। সে দেশের পার্লামেন্টে দ্রুতই এই আইন পাশ হতে চলেছে। তবে প্রচলিত নীল ছবি নয়, প্রতিশোধ স্পৃহায় বানানো পর্ন ছবি। পোশাকি ভাষায় যাকে বলে রিভেঞ্জ পর্ন। নয়া আইনে বলা হবে, কারুর অনুমতি ছাড়া তাঁর নগ্ন বা আপত্তিজনক ছবি প্রকাশ্যে আনলে হতে পারে কারাদণ্ড। অনলাইন বা অফলাইনে এই ধরনের ছবির প্রচার করলেও পড়তে হবে শাস্তির মুখে।
গোটা ব্রিটেন জুড়ে এখন রিভেঞ্জ পর্নের বাড়বাড়ন্ত। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর প্রেমিক-প্রেমিকাকে পর্যুদস্ত করতে তৈরি করা হয় এই রিভেঞ্জ পর্ন। সম্পর্কে থাকার সময় তোলা কিছু ঘনিষ্ঠ ছবি মোবাইল ফোনে বা কম্পিউটারে থাকলেই হল। কেন আমার সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙলে? এই অভিযোগে প্রেমিক-প্রেমিকার সঙ্গে সেই ঘনিষ্ঠ ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয় সোশ্যাল সাইটে। শিশুরাও বাদ যাচ্ছেন না প্রতিশোধের তালিকা থেকে। মাত্র ১১ বছরের কিশোররাও শিকার হচ্ছেন রিভেঞ্জ পর্নের। এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই এবার আইন করে পর্ন বন্ধ করতে চলেছে সে দেশের সরকার। গত আড়াই বছরে মোট ১৪৯টি রিভেঞ্জ পর্নের অভিযোগ উঠেছে মোট আটটি পুলিশ স্টেশনে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিকার হচ্ছেন মহিলারা।
- See more at: http://www.bd24live.com/bangla/article/7761/index.html#sthash.ruPoAEo9.dpuব্রিনিষিদ্ধ হতে চলেছে পর্ন। পর্ন বানালে বা প্রকাশ করলে হতে পারে দু’বছরের কারাদণ্ড। সে দেশের পার্লামেন্টে দ্রুতই এই আইন পাশ হতে চলেছে। তবে প্রচলিত নীল ছবি নয়, প্রতিশোধ স্পৃহায় বানানো পর্ন ছবি। পোশাকি ভাষায় যাকে বলে রিভেঞ্জ পর্ন। নয়া আইনে বলা হবে, কারুর অনুমতি ছাড়া তাঁর নগ্ন বা আপত্তিজনক ছবি প্রকাশ্যে আনলে হতে পারে কারাদণ্ড। অনলাইন বা অফলাইনে এই ধরনের ছবির প্রচার করলেও পড়তে হবে শাস্তির মুখে।
ব্রিটেনে নিষিদ্ধ হচ্ছে পর্ন ছবিগোটা ব্রিটেন জুড়ে এখন রিভেঞ্জ পর্নের বাড়বাড়ন্ত। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর প্রেমিক-প্রেমিকাকে পর্যুদস্ত করতে তৈরি করা হয় এই রিভেঞ্জ পর্ন। সম্পর্কে থাকার সময় তোলা কিছু ঘনিষ্ঠ ছবি মোবাইল ফোনে বা কম্পিউটারে থাকলেই হল। কেন আমার সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙলে? এই অভিযোগে প্রেমিক-প্রেমিকার সঙ্গে সেই ঘনিষ্ঠ ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয় সোশ্যাল সাইটে। শিশুরাও বাদ যাচ্ছেন না প্রতিশোধের তালিকা থেকে। মাত্র ১১ বছরের কিশোররাও শিকার হচ্ছেন রিভেঞ্জ পর্নের। এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই এবার আইন করে পর্ন বন্ধ করতে চলেছে সে দেশের সরকার। গত আড়াই বছরে মোট ১৪৯টি রিভেঞ্জ পর্নের অভিযোগ উঠেছে মোট আটটি পুলিশ স্টেশনে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিকার হচ্ছেন মহিলারা।

সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৪

মাথায় হিজাব, শরীরে আঁটসাঁট ?

বিষয়টি নিয়ে ইন্দোনেশিয়ায় বিতর্ক শুরু হয়েছে৷ ইদানীং সে দেশে হিজাব পরা নারীর সংখ্যা বেড়েছে৷ কিন্তু তাদের শরীরে থাকছে আঁটসাঁট পোশাক – মুসলিম পণ্ডিতরা যেটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন৷ ইন্দোনেশিয়ায় এ ধরনের পোশাক জিলবুবস নামে পরিচিতি পেয়েছে৷ শব্দটা আলাদা দুটো শব্দের মিশ্রণ৷ জিল এসেছে জিলবাব থেকে৷ ইন্দোনেশিয়ায় হিজাবের আরেক নাম এটি৷ আর স্তন শব্দের প্রচলিত স্ল্যাং বা অপশব্দ হচ্ছে বুবস৷ আঁটসাঁট পোশাক হচ্ছে সেটা, যা পরলে স্তন আর পেছনের দিকটা প্রকাশিত হয়ে যায়৷
আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান ইন্দোনেশিয়ান কাউন্সিল অফ মুসলিম স্কলারস সম্প্রতি জিলবুবস পরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে৷ সংস্থার ডেপুটি চেয়ারম্যান মারুফ আমিন বলেন, নারীরা যে জিলবাব পরছে সেটাকে আমরা স্বাগত জানায়৷ কিন্তু অনেকে দেখা যাচ্ছে তার সঙ্গে এমন পোশাক পরছে যেটা শরীরের বিশেষ অংশ বের করে দিচ্ছে৷ আমরা (কাউন্সিল) এটা একেবারে নিষিদ্ধ ঘোষণা করছি৷
এই সংস্থার কোনো নিয়ম জনগণ মানতে বাধ্য নয়৷ তাই ইন্দোনেশীয়রা এতদিন কাউন্সিলের ঘোষণাগুলো উপেক্ষাই করে এসেছে৷
তবে কাউন্সিলের এবারের সিদ্ধান্তে ইন্দোনেশিয়ার নারীদের মধ্যে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে৷ কেউ এটাকে সমর্থন করছেন, কেউ তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছে৷ আবার একটা অংশ আছে যাঁরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মজার সমালোচনা করেছেন৷
নারীবাদী লেখক জুলিয়া সুরিয়াকুসুমা জাকার্তা পোস্ট-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে মুসলিম পণ্ডিতদের নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তের নিন্দাজানিয়েছেন৷ তিনি লিখেছেন, জিলবুবস হচ্ছে ধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বায়িত চেতনার সংমিশ্রন....একটা ফ্যাশন ট্রেন্ড৷
মুসলিম লেখক আসমা নাদিয়া মনে করেন, জিলবুবস নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে সেটা মুসলিম রীতি যাঁরা পালন করছেন সেসব নারীদের জন্য একটা সতর্কবাণী৷ মুসলিম নারী যাঁরা শরীর ঢাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁদের পোশাক পরায় আরেকটু সাবধান হওয়া উচিত৷
তিনি মনে করেন, শালীনতাবোধটাই যদি মূল বিবেচ্য বিষয় হয় তাহলে ফ্যাশন আর শালীনতাবোধ একসঙ্গে চলতে পারে৷ এদিকে ফেসবুকে একটি পেজ খোলা হয়েছে যেখানে মেয়েরা তাঁদের জিলবুবস পরা ছবি পোস্ট করছেন৷ ফেব্রুয়ারি মাসে খোলা এই পেজে ইতিমধ্যে প্রায় ৪২ হাজার লাইক পড়েছে৷

শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৪

পুরুষ ধর্ষণের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে যুক্তরাষ্ট্রে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পুরুষ ধর্ষণের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে। সম্প্রতি এক জরিপে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। যৌন অপরাধের মাত্রা জানতেই এ জরিপ চালানো হয়, সে জরিপেই দেখা গেছে, পুরুষ ধর্ষণের সংখ্যা আগের চেয়ে অনেকটাই বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন সেন্টারের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।
২০১১ সাল থেকে যৌন অপরাধ সংক্রান্ত ওই জরিপ পরিচালনা করা হয়। এ জরিপে টেলিফোনে ১২ হাজার ৭২৭ জন নারী-পুরুষের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। তাদের সবার বয় ১৮ থেকে ৫০। জরিপ থেকে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৫ জন নারীর একজন জীবনের কোনো না কোনো সময় ধর্ষণের শিকার হন।
অর্থাৎ শতকরা হিসাবে সেখানে প্রায় ২০ শতাংশ নারী ধর্ষণের শিকার হন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ২ কোটি ৩০ লাখ নারী বাস করেন। তাদের মধ্যে প্রায় ১৯ লাখ নারীই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
অন্যদিকে পুরুষরাও ধর্ষণের শিকার হন ১.৭ শতাংশ। এ সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক বেশি। তবে ওই প্রতিবেদনে পুরুষ ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে তেমন কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি।

মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৪

নারীর অন্তর্বাস ইতিহাস

বিবর্তনের মানসিকতায় দেখা যায় পুরুষ ও নারী অপর লিঙ্গের শারীরিক গঠনের ওপর আগ্রহবোধ করে। নারীর শারীরিক গড়নের একটি আকর্ষণীয় অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয় তার স্তনযুগলকে। স্তন নারীত্ব এবং উর্বরতার প্রতীকও!
তবে ইতিহাসগত ভাবে স্তনের সৌন্দর্য উপলব্ধির ঘটনা খুব বেশি পুরোনো নয়। প্রাচীনকালে স্তনকে সৌন্দর্য ও যৌনতার বাহক হিসেবে মোটেও গণ্য করা হতো না। এমনকি তা আড়াল করার চেষ্টাও খুব একটা করা হতো না।
আদিম মানব-মানবী যখন রং দিয়ে শরীর রাঙাত তখনো বুকের চেয়ে মুখই প্রাধান্য পেত বেশি। যেকোনো প্রাচীন চিত্রে নারীর স্তন উন্মুক্তই দেখা যায়। এমনকি খ্রীষ্টিয় সময়ের প্রথম দিকে যেসব ছবি ও ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছিল, তাতেও নারীর বক্ষ প্রায় অনাবৃত। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় অবশ্য নারীস্তনে প্রসাধনী ও গন্ধদ্রব্য ব্যবহারের চল ছিল এবং স্তন ঢাকা পরতো অলংকারে। ভারতীয় উপমহাদেশেও বক্ষ আবৃত করার জন্য কাপড়ের প্রচলন হয় অনেক পরে। লম্বা মালায় ঢেকে থাকত স্তনযুগল।
মোটকথা, প্রাচীন কোনো সামাজিক বা সাংস্কৃতিক তথ্য নেই যার উপর ভিত্তি করে আজকের নরনারীর মনে স্তনের যৌন ও সৌন্দর্যবোধ জেগে ওঠে। মূলত ভিক্টোরীয় যুগে যখন মেয়েদের সাংস্কৃতিক অবদমন শুরু হয়, তার আগে পর্যন্ত নারীস্তনকে ঘিরে সৌন্দর্যবোধ ও যৌনতার কোনো প্রত্যক্ষ যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মূলত তখন থেকেই স্তনকে সৌন্দর্য-অঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা শুরু হয় এবং এখান থেকেই বক্ষবন্ধনীর সূত্রপাত।
বক্ষবন্ধনী বা কাঁচুলি নারীদের এমন এক ধরনের অভ্যন্তরীণ পোশাক, যা স্তনকে আবৃত ও সঠিক স্থানে রাখতে সাহায্য করে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী বক্ষবন্ধনী স্তনকে সুগঠিত ও সুডৌল করতে সাহায্য করে এবং স্তনযুগলের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। যদিও এ ধারণা যথেষ্ট বিতর্কিত! আধুনিক গবেষণামতে, বক্ষবন্ধনী কোনো উপকারে আসে না, বরং তা ক্ষতির কারণ হতে পারে। বক্ষবন্ধনীর একটানা ব্যবহার স্তন টিউমার ও স্তন ক্যানসারের অন্যতম কারণ বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত দেন।
উনিশ শতকের শেষের দিকে বক্ষবন্ধনী প্রচলিত হয়। এ সময় ইউরোপের মেয়েরা কর্সেট নামে এক ধরনের অন্তর্বাস পরতেন। এটা এত আঁটসাঁট ছিল যে তাঁরা বাঁকা পর্যন্ত হতে পারতেন না! এই সময়ে ‘কৃত্রিম স্তন’- এর প্রচলন হয়। লেদার, কুইল্টেড স্যাটিন, ইন্ডিয়া রাবার ইত্যাদির তৈরি এসব স্তনকে ইচ্ছেমতো ফোলানো যেত!
বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে কর্সেটের নিচে লেস যোগ করা হলো। কিন্তু জনমত যেতে লাগল এর বিরুদ্ধে। নর্তকী ইসাডোরা ডানকান এবং লোই ফুলার কোমর পর্যন্ত কর্সেটকে করে ফেলেন বুকের নিচ পর্যন্ত এবং এতে ব্যবহার করেন প্রাচীন গ্রিকদের মতো আকারহীন ঝোলা কাপড়।
এরপর বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার মাদলিন ভিয়োনেঁ কর্সেট কেটেছেঁটে পরিধানকারীকে নড়াচড়া করার স্বাধীনতা দিলেন।
১৯১৩ সালে মারি ফেলপস জেকব নামের এক আমেরিকান যুবতী নতুন এক ধরনের বক্ষবন্ধনীর উদ্ভাবন করলেন। এটি নরম, ছোট এবং এমনভাবে বানানো যা দুই স্তনকে আলাদাভাবে এবং স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ঢাকল। মারি পরে তাঁর পেটেন্ট ওয়ার্নার কোম্পানিকে বিক্রি করে দেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর কর্সেটের প্রচলন একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল। মেয়েরা স্তন ছোট রাখে এমন বক্ষবন্ধনী ও ঢিলেঢালা সেমিজের দিকে ঝুঁকে পড়ল। মূলত এসময়েই ‘ফ্ল্যাট চেস্ট’-এর যুগ শুরু হয়।
তিরিশের দশকে ডানলপ কোম্পানি ল্যাটেক্স রাবার আর অ্যামোনিয়া মিশিয়ে ল্যাসটেক্স নামের নরম ইলাস্টিক সুতার তৈরি করে। এই সুতা দিয়ে তৈরি করা হতো এক ধরনের অন্তর্বাস, যা মোজার পরে নেয়া যেত। পরে এর ভেতরে প্যাড ও তারের ব্যবহার শুরু হলো।
পঞ্চাশের দশকে এমনভাবে বক্ষবন্ধনী তৈরি করা শুরু হলো, যাতে স্তনকে বর্ধিত দেখায় এবং নারীত্ব বৃদ্ধি করে। এসময় জেন রাসেলের জন্য বিশেষ বক্ষবন্ধনী ‘এয়ারোডাইনামিক ব্রা’ তৈরি করা হয়, যেটা বিখ্যাত সিনেমা ‘The Outlaw’তে দেখানো হয়েছিল।
ষাটের দশকে বক্ষবন্ধনীর বিরুদ্ধে প্রকাশিত হলো আক্রোশ! ফেমিনিস্ট আন্দোলনে পোড়ানো শুরু হলো বক্ষবন্ধনী। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টাতে বেশি সময় লাগল না। স্তনযুগলকে সামলানোর জন্য আবার ফিরে এলো বক্ষবন্ধনী। এবার শুরু হলো আকার-আকৃতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্যাড ও তারের ব্যবহার।
বক্ষবন্ধনী নারীদের অত্যন্ত গোপনীয় একটি পোশাক হলেও এটা নিয়ে গবেষণার অন্ত নেই! এমনকি এতে যুক্ত করা হচ্ছে প্রযুক্তিও! জাপানী অন্তর্বাস নির্মাতা কোম্পানি ট্রায়াম্প ২০০৫ সালে বাজারে এমন এক ধরনের বক্ষবন্ধনী ছেড়েছিল, যেটা মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার করে গরম করে ঘর উষ্ণ রাখার কাজে ব্যবহার করা যেত। এটি শীতের দিনে ঘর গরম করার বাড়তি খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল।
২০০৬ সালে এই ট্রায়াম্প কোম্পানিই বাজারে এনেছিল ব্যাগযুক্ত বক্ষবন্ধনী। এর কাপের ভেতর ভাঁজ করে লুকিয়ে রাখা হতো ব্যাগ, যা শপিং ব্যাগ হিসেবে ব্যবহার করা যেত। কোম্পানির দাবি ছিল যে, এমন অন্তর্বাস পলিথিন ব্যাগ ক্রয়ে নারীদের নিরুত্‍সাহিত করবে। একই কোম্পানি বছর দুয়েক আগে তৈরি করেছিল ‘ম্যারেজ হান্টিং ব্রা’! বিয়ের পোশাকের মতো দেখতে এ বক্ষবন্ধনীতে একটি লেড ডিসপ্লে ছিল, যেখানে ব্যবহারকারী কতদিন ধরে স্বামী খুঁজছেন তা দেখা যাবে।
গত বছর অতিরিক্ত গরম থেকে নারীদের রেহাই দেবার জন্য ট্রায়াম্প তৈরি করেছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বক্ষবন্ধনী। এতে ছিল রেফ্রিজারেটর জেল প্যাড, যা বিশেষ প্রক্রিয়ায় শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে দিত।
সম্প্রতি ধর্ষণ ঠেকাতে নারীদের জন্য একটি বিশেষ ধরনের বক্ষবন্ধনী তৈরি করেছেন ভারতের তিন শিক্ষার্থী। এই অন্তর্বাস পরিহিত কেউ আক্রান্ত হলে সাথে সাথে বার্তা চলে যাবে পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের কাছে। এছাড়া এতে রয়েছে একটি শক প্রযুক্তি যা হামলাকারীকে ৩৮০০ কিলোভোল্টের শক দিতে পারবে। তাও এক বা দুবার নয়, ৮২ বার! এই অন্তর্বাসের ভেতরে থাকবে বিশেষ পলিমার যাতে পরিহিত ব্যক্তিকে শক না লাগে।
সুপ্রাচীনকালে স্তনযুগলকে আবদ্ধ করে রাখার জন্য ব্যবহার করা হতো কাপড়ের টুকরো। বর্তমানে এ কাজটি করে দেয় বক্ষবন্ধনী। তাই পোশাকী সৌজন্যতা বা নারীসুলভ ব্যক্তিত্ব প্রকাশে বক্ষবন্ধনীর আবেদন অপরিসীম। চিকিত্‍সাবিজ্ঞানের যুক্তিতর্ক যা-ই বলুক না কেন, মেয়েরা খুব সহজে বক্ষবন্ধনীর ব্যবহার বন্ধ করবে বলে মনে হয় না।