শনিবার, জুলাই ১৯, ২০১৪

বিয়ে নিয়ে বিলাসিতা !

বয়সটা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। এখনো কারো সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা হয়নি। হবে হবে করে হচ্ছেও না। এদিকে আপনজনের তাড়াহুড়া এবার একজনকে বেছে নাও। তবুও হয়ত মন সায় দিতে চায় না। মনের গহীনে কেমন যেন একটা ভয় কাজ করে। লোকে ভাবে এ বুঝি বিলাসিতা। আসলে কি তাই?
হ্যাঁ, অনেকের কাছে হয়ত বিলাসিতা। তবে বেশিরভাগ নর-নারীর কাছে নয়। ‘ও তো এখনই কেমন পাল্টে গেছে। এত পজেসিভ, ইমোশনাল। বিয়ের পর যদি আরও পাল্টায়?’Ñএমন একটা ভয় অনেকের মনেই দানা বাঁধে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ফোবিয়া। বিয়ের ক্ষেত্রে বলা হয় ‘বিয়ে-ফোবিয়া’।
সেই আদিকাল থেকে এ রকম ভাবনা আমাদের মাথায় জেঁকে বসে। সৌজন্যে গল্প-উপন্যাস-সিনেমা থিয়েটার। প্রেমের বেলায় মাখো-মাখো, গদগদ, আর বিয়ে করতে বললেই যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়ে হয় বিয়েটাকে যত পারা যায় পিছিয়ে দেওয়া আর সাহস খানিক বাড়লে ¯্রফে পিঠটান। আর এখানেই ভুলটা করে ফেলেছেন আপনি।
আধুনিক যুগের অনেক স্মার্ট মেয়েও মোটেই বিয়ে-ফোবিয়ায় কম যান না। কমিটমেন্টের কথায় পিছিয়ে আসা, বিয়ে নামের দায়িত্ব-প্যাকেজ এড়াতে সম্পর্কটাকেই ভেঙেচুরে ফেলা কিংবা পজেসিভ, ইমোশনাল, সেন্টিমেন্টাল বয়ফ্রেন্ড স্বামীরূপে অবতীর্ণ হলে আরও কী কী ঘটিয়ে ফেলতে পারে, সেই আশঙ্কায় নতুন পুরুষে আকৃষ্ট হওয়ার মধ্যেও মোটেই খারাপ কিছু দেখছেন না আজকের নারীরা। বরং জোর গলাতেই বলছেন জোর করে, ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়েটা করে ফেললে সম্পর্কটাই তেতো হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং প্রেমটাই থাকুক।
বিয়ে, গভীরতর সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া, দায়-দায়িত্ব ঘিরে ভয়, আশঙ্কা। আর তার ফলে পিছিয়ে যেতে চাওয়া সম্পর্কটা থেকেই। বেশ কবছর আগেও এই কমিটমেন্ট ফোবিয়া ব্যাপারটিই ছিল একেবারে পুরুষালী দুনিয়ার গল্প। কিন্তু যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দুনিয়া চষে ফেলতে ফেলতেই মেয়েদের মধ্যেও জন্ম নিচ্ছে এই চেনা ভয়ের বীজ। স্বাধীন, খেয়ালখুশি মতো যখন যা ইচ্ছে করে ফেলতে পারা জীবনটাকে হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা। কিংবা ক্যারিয়ারে তরতরিয়ে এগোনোর বদলে বর-বাচ্চা-শ্বশুরবাড়ি-কর্তব্যপালনে আটকা পড়ে যেতে না চাওয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগের মতো চার দেয়ালের জীবন ছেড়ে মেয়েরাও বেরিয়ে এসেছে অনেক কাল হলো। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে, নিজের মতো করে চিনতে শিখেছে দুনিয়াটাকে। আগে যেটা ছিল ¯্রফে ছেলেদের একাধিপত্য, সেই স্বাধীন জীবনযাপনের স্বাদ ছুঁয়েছে তাদেরও। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেকটা কমে এসেছে সমাজের চোখ রাঙানি। ফলে নিজের মতো বাঁচার, নিজের পছন্দসই পার্টনারের খোঁজে দুনিয়া চষে ফেলার যে আকাক্সক্ষা, যে ক্ষমতাটা এত দিন ¯্রফে ছেলেদের জীবনের অঙ্গ ছিল, মেয়েদের জীবনেও সেটি গুটি গুটি ঢুকে পড়েছে।
কমিটমেন্ট ফোবিয়া তৈরি হয় এক ধরনের ভয় বা আত্মবিশ্বাসের অভাব থেকে। স্বেচ্ছায় সম্পর্কে গেলেও যেই তাতে নানা রকম দাবি আসতে থাকে, মেয়েটি পিছিয়ে আসে। কখনো সেটা দায়-দায়িত্ব সামলে নেওয়ার আত্মবিশ্বাসের অভাবে, কখনো ছেলেটি দমিয়ে রাখলে ক্যারিয়ার থমকে যাওয়া, কখনো বা নিজের মতো বাঁচার অধিকার হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায়, আবার কখনো ছেলেটি তাকে ভালো রাখবে কি না, তাকেই চিরকাল ভালোবাসবে কি নাÑ এ ধরনের দ্বিধায়। পুরনো কোনো প্রেম ভাঙার তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকলে আবার ঠকে যেতে পারে, এমন ইনসিকিওরিটি বা হীনন্মন্যতা বোধও এই কমিটমেন্ট ফোবিয়ার জন্ম দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে প্রথমে নিজেও অনুধাবন করা যায় না সমস্যাটা। হয়ত ছেলেটার খুত ধরে, সম্পর্ক ভাঙার জন্য তাকেই দায়ী করা হয়। কিন্তু বারবার এ রকমই হতে থাকলে কেউ না কেউ যখন প্রশ্ন তুলতে শুরু করে, তখন হয়ত বা নিজের মনে প্রশ্ন জাগে। তার পর হয় নিজেকে শোধরান কিংবা এ ভাবেই চালিয়ে যেতে চান। তবে কাউন্সেলিং করে এই ধরনের সমস্যা কাটিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন চিকিৎসকরা।
অনেকে আবার প্রেমে ব্যর্থ হয়ে দিনের পর দিন কাজল নদীর জলে বুক ভাসিয়ে দেন। সেই জলে তার স্মরণে প্রদীপ ভাসান। নিজেকে নিজেই বলতে থাকেন, ভালো ছিল দিনগুলো কোলাহল মাখা! নিজের জীবন নিয়ে এমন জুয়া খেলার কোনো মানে আছে বলে মনে হয় না। প্রেম হয়ত শ্বাশ্বত, হয়ত নশ্বর। তবু বাস্তবতাকে আপন করে সাজিয়ে নিতে ভুল করবেন না । কোনো গোধূলি বেলায় দূর আকাশ থেকে যদি ভেসে আসেÑ পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই, তবে তাকেই সত্য মানুন না!